Home » জাতীয় » ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সংগ্রামীদের ভূমিকা

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সংগ্রামীদের ভূমিকা

মোঃ কায়ছার আলী,দিনাজপুুর,থেকে ।। ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মিয়ানমার সফরে গিয়ে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধি সৌধ পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি পরিদর্শক বইতে লিখেছিলেন, হিন্দুস্থানে তুমি দু’গজ মাটি পাওনি সত্য, তবে তোমার আত্মত্যাগ থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আওয়াজ উঠেছিল। দুর্ভাগ্য তোমার নয় জাফর, স্বাধীনতার বার্তার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষের সুনাম ও গৌরবের সঙ্গে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর বা দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ (২৪ অক্টোবর ১৭৭৫-৭ নভেম্বর ১৮৬২) মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বশেষ প্রতিনিধি, মরমী কবি ও সুফি সাধক সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের জীবন ইতিহাসের বড় ট্রাজেডি হয়ে আছে। তাঁর রচিত কবিতা ও গজল এই ভাগ্য বিড়ম্বিত সম্রাটের নির্বাসিত জীবনের একাকিত্ব, বিষাদ আর অসহায়ত্বের অনবদ্য সাক্ষ্য বহন করছে। যে কয়েকজন প্রবাদপুরুষ অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেম ও চরম আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছিলেন, এই বাংলার মাটিতে স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ বপন করেছিলেন তন্মধ্যে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন সম্রাট বাবর, হুমায়ন, আকবর, জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের উত্তরসূরি শেষ মুঘল সম্রাট। মুঘল সাম্রাজ্যের মহাদুর্দিনে তিনি ভারতবর্ষের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বাহাদুর শাহ জাফর সিপাহিদের বিপ্লব তথা ভারতবর্ষের প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন – এই সংবাদে কানপুর, লক্ষ্মৌ, বিহার, ঝাঁসি, বেরিলি থেকে শুরু করে পশ্চিম ও পূর্ববাংলার সর্বত্র সিপাহিরা গর্জে ওঠে খালক-ই-খুদা, মুলক-ই-বাদশাহ, হুকুম-ই সিপাহি, অথাৎ আল্লাহর দুনিয়া, বাদশাহ রাজ্য, সিপাহির হুকুম। একের পর এক সেনা ছাউনিতে বিদ্রোহ হতে থাকে। ইংরেজরা অতি নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করে। হাজার হাজার স্বাধীনতাকামীর রক্তে রঞ্জিত হয় ভারত বর্ষের মাটি। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষও বিক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু ভারতীয়দের এই সংগ্রাম সফল হতে পারেনি। ইংরেজরা দিল্লি দখল করে নেয় এবং সম্রাট ২১ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পন করেন। ইংরেজ সৈন্যরা মির্জা মুঘল, মির্জা খিজির সুলতান, মির্জা আবু বকরসহ ২৯ জন মুঘল শাহজাদা ও বহু আমির ওমরাহ, সেনাপতি এবং সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সম্রাটকে বিচারের নামে প্রহসনের আদালতে দাঁড় করানো হয়। ইংরেজ সরকার তাঁর শাস্তি চরম অর্থাৎ মৃত্যুদন্ড হওয়া উচিত। কিন্তু তাঁর বার্ধক্যের কথা বিবেচনা করে প্রান দন্ডদেশ না দিয়ে বেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ১৭৫৭ সালে ২৩শে জুন ভাগীরথীর তীরে পলাশির প্রান্তরে সেই যুদ্ধে প্রবীন সেনাপতি মির্জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা তথা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে এবং তিনি নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন। তখন বাংলার কর্ণধার হয়ে ক্ষমতার বসলেন কোম্পানীর এক সামান্য চাকুরে, ধূর্ত ও দুধর্ষ ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ। সেই থেকে শুরু এবং পরবর্তী একশ বছরের মধ্যে দেখা গেল তাদের অধিকাংশ তাদের পদানত। ছোট একটি কোম্পানী হয়ে হয়ে গেল ভারতবর্ষের মত এত বড় একটা দেশের মালিক। ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথ ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের “দি গর্ভনর এন্ড কোম্পানী অফ মার্চেন্টস অফ লন্ডন ট্রেডিং ইনটু দি ইন্ডিজ” কে অনুমতি দেন প্রাচ্যে বানিজ্য করার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রথমে বাণিজ্যের অনুমতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য মোঘল সম্রাট, সুবাদার থেকে শুরু করে যখন যার দরকার তখন তার কাছে দরবার করেছে, অপমানিত হয়েছে কিন্তু হাল ছাড়েনি বা ধৈর্য হারায়নি। ১৬১৩ সালে মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এই কোম্পানীকে বানিজ্য কুঠি স্থাপনে অনুমতি দেন। আর এদিকে দিল্লীর মসনদের সম্রাট শাহজাহানের চার পুত্র ও দুই কন্যার মধ্যে অশান্তির দাবানল জ্বলছিল। দারাশিকো সর্বাপেক্ষা প্রীতিভাজন, সুজা অসুস্থ পিতার সংবাদে দিল্লী অভিমুখে গিয়ে বারানসির যুদ্ধে দারার কাছে পরাজিত হন। আওরঙ্গজেব ও মুরাদ দুজনে মিলে দারাকে পরাজিত করেন, কথা ছিল সিংহাসনে বসবেন মুরাদ। দারা পরাজিত হলেন এবং পাঞ্জাবে পালিয়ে গেলেন। এক উৎসব রজনীর অবসানে সুজাসহ বন্দী হল মুরাদ। আওরঙ্গজেব নিজেকে সম্রাট ঘোষনা করলেন এবং আগ্রা দুর্গে পিতা শাহ্জাহান বন্দী হলেন। এক নিশীথকালে আওরঙ্গজেব পিতার কাছে পাঠালেন এক সুদৃশ্য মোড়ক। পরতের পর পরত খুলে দেখে পুত্র দারাশিকোর খন্ডিত মুন্ড। রোশনারা ভাই শাহজাহানের পক্ষ নিলেন। বোন জাহানারার øেহভাজন এক বাদীর হঠাৎ বসনে আগুন লেগে যায়। আগুন নিভাতে গিয়ে দগ্ধ হন জাহানারা। ফলে তাঁর জীবন সংশয় দেখা দেয়। খবর পেয়ে চিকিৎসা করতে আসেন ইংরেজ চিকিৎসক গ্যাব্রিয়েল বাউটন। সামাজিক প্রথার বাইরে হলেও জাহানারার সম্মাতিতে বা জীবন বাঁচানোর স্বার্থে চিকিৎসক রোগীকে নিজ চোখে দেখেন এবং চিকিৎসা করেন। জাহানারা সুস্থ হয়ে উঠলেন। পুরস্কার হিসেবে বাউটন ব্যক্তিগতভাবে কিছু না চেয়ে কলকাতা থেকে ১৪০ মাইল দক্ষিনে বালাশোররে কুঠি নির্মানের এবং বিনা শুল্কে বানিজ্য লাভের অধিকার চাইলেন। ইংরেজরা তৎকালীন মোঘল সম্রাট আজম-উশ-শানের কাছে ১৬১০ সালে হুগলী নদীর তীরবর্তী সুতানটি গ্রামটি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে এর সাথে যোগ হয় কলকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রাম। তারা ১৬৫১ সালে হুগলীতে ও ১৬৫৮ সালে কাশিমবাজারে বানিজ্যকুঠি স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে তাদের সাম্রাজ্যবাদ বি¯তৃত হতে লাগল। ১৮৫৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা সিপাহী বিপ্লবের পর কোম্পানীর কাছ থেকে গ্রেট ব্রিটেনের রাণী ভিক্টোরিয়া এদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। ভারতবর্ষের কাপড় এবং ঢাকার মসলিন পৃথিবীর বিখ্যাত ছিল। ১৭৬৮ সালে জেমস্ ওয়াট বাষ্প চালিত ইঞ্জিন আবিস্কার করলে ইংল্যান্ড কৃষি থেকে শিল্প বিপ্লবের দিকে যাত্রা শুরু করে। লর্ড কর্ণওয়ালিস ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন জারি করলে শাসক ও শোষিত দুইটি শ্রেণি তৈরি হয়। জমিদারের নাতির জন্মদিন, জামাই আসবে ইত্যাদি বলে তাদের পোষা পাইক, পেয়াদা, লাঠিয়াল বাহিনী কৃষকদের কাছ থেকে জুলুম করে খাজনা নিত। জমিদার আর কৃষকের মাঝামাঝি মধ্যস্বত্বভোগী মহাজন কাজকর্ম ছাড়াই খাজনা নিয়ে তৈরি হল। মুসলমানেরা ইংরেজি না জানার জন্য চাকরি বাকরি সহ সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হল। অত্যাচারিত হতে হতে তাদের মধ্যে একটা বিদ্রোহ ভাব দেখা দিল। ঊনিশ শতকে ভারত জুড়ে ওয়াহাবি বিদ্রোহ হয়েছিল এবং এর নেতৃত্বে ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান বায়বেরিলির সৈয়দ আহমদ। তাঁর আদর্শে ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন তিতুমীর এবং হাজী শরীয়তউল্লাহ। এ আন্দোলন শুধু ধর্মীয় আন্দোলনই ছিল না এর সঙ্গে অর্থনীতি ও রাজনীতি জড়িত ছিল। ওয়াহাবিরা চেয়েছিলেন ইংরেজ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে। তারা বলতেন, দারুল-হরব বা শত্র“র দেশ। ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবর্তক ও নেতা হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার ছোট্ট গ্রাম শ্যামাইলে ১৭৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকালে তাঁর মা এবং আট বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। গ্রামের মক্তবে পড়াশুনা শেষ করে হুগলীর ফুরফুরা গিয়ে আরবী ও ফার্সি ভাষা শিখে বিভিন্ন ইসলামী ব্যক্তিবর্গের সাহচর্যে থাকার পর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় কিছু দিন থেকে নিজ দেশে ফিরে আসেন। সে সময় বাংলার মুসলমানের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর করে এবং বেদআত ও র্শেক মুক্ত ইসলাম পালনের জন্য তাঁর অনুসারীদের নিদের্শ দেন। কবর পূজা, পীর পূজা, সেজদা দেওয়া হল র্শেক এবং মহরমের মাতম করা, গাজী কালু, খাজা খিজিরের আরাধনা বা পঞ্চপীরের গুন গাওয়া বেদআত। সে সময় হিন্দু জমিদাররা মুসলমান কৃষকদের কাছে জোর জবরদস্তি করে নানা রকম পূজার খাজনা আদায় করতেন। আবার কুরবানির সময় মুসলমান প্রজাদের কুরবানি দেওয়া শুরু করলে জমিদারদের সাথে বিরোধ দেখা দেয়। বিরোধিতা এবং তাঁর অনুসারীর সংখ্যা একই সাথে বাড়তে থাকে। তিনি চেয়েছিলেন সামাজিক এবং ধর্মীয় জীবনে পরিশুদ্ধির মাধ্যমে মুসলমানেরা যেন নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখে। ১৮৪০ সালে তাঁর মৃত্যু হলে ছেলে দুদু মিয়া (জন্ম ১৮১৯) ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহন করেন। মক্কা শরীফ থেকে শিক্ষা লাভের পর অসাধারণ সাংগঠনিক গুনের অধিকারী দুুদু মিয়া ফরায়েজীদেরকে সংঘবদ্ধ ও সুসংহত করে তাদের মধ্যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জাগরিত করেন। জামিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য তিনি এক শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন। সংগঠনের সুবিধার্থে তিনি বাংলাদেশকে কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করেন। প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য এক একজন করে খলিফা নিযুক্ত করেন এবং ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি, বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ কূটনৈতিক কলাকৌশল প্রয়োগ ইত্যাদি খলিফাদের কাজ ছিল। নিজ নিজ অঞ্চলের সমস্ত খবরাখবর দুদু মিয়াকে নিয়মিতভাবে জানানো ছিল খলিফাদের অপর একটি কাজ। দুদু মিয়া জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারে জর্জরিত কৃষক, শ্রমিক, কারিগর প্রভৃতি দরিদ্র ও নির্যাতিত মানুষকে সংঘবন্ধ করেন। তাঁর পিতার সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারকে বৈপ্লবিক স্তরে উন্নীত করেন। তাঁর কর্মসূচি ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। ফলে এ আন্দোলনের গুনগত পরিবর্তন ঘটে। তিনি ঢাকা, পাবনা, যশোর, মালদহ, বারাসত প্রভৃতি অঞ্চলে অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবর্তীণ হন। এর ফলে জমিদার, নীলকর ও ব্রিটিশ সরকার সম্মিলিতভাবে দুদু মিয়ার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জোট গঠন করে। ১৮৪৭ সালে তিনি এ সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এ সংগ্রাম দমনে ব্যর্থ হয়ে সরকার দুদু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। ১৮৬০ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের আতঙ্ক দুদু মিয়া ১৮৬২ সালে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। যোগ্য উত্তরসুরি না থাকায় তাঁর নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ হয়নি। ফলে ফরায়েজী আন্দোলন দূর্বল হয়ে পড়ে। আন্দোলন কখনো কখনো থার্মোমিটারের পারদের মতো উঠানামা করে। ১৭৮২ সালে চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার বসিরহাট থানার অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে এক আলোকবর্তিকা বা ধূমকেতুর জন্ম হয়। যাঁর নাম মীর নিসার আলী তিতুমীর। ফার্সি, আরবী, উর্দু, বাংলা এবং অংক বিষয়সহ স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি খেলাধুলায়ও পারদর্শিতা অর্জন করেন। তাঁর জন্মভূমি চব্বিশ পরগনা থেকে নদীয়া পর্যন্ত ছিল নীল চাষের কেন্দ্রবিন্দু। নীল নামক এক প্রকার গাছ থেকে রং সংগ্রহ করা হত। এ রং সুতি বস্ত্রে ব্যবহার করলে ঐ কাপড়ের চাহিদা ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। এ জন্য ইংরেজ নীলকররা বাংলায় আগমন করে নীল উৎপাদিত অঞ্চলসমূহে কুঠি স্থাপন করে কৃষকের উৎকৃষ্ট জমিতে দাগ দিয়ে বিনামূল্যে বীজ যোগান দিয়ে দাদন প্রথার প্রচলন করে, দেড়বিঘাকে এক বিঘা জমি হিসাব করে, জাল চুক্তিপত্র তৈরি করে, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে অমানসিক নির্যাতন চালিয়ে, বাড়িঘর পুড়ে ফেলে, স্ত্রী কন্যাকে অপহরণ করে, কৃষকের গরু বাছুর ধরে নিয়ে আটকে রেখে, মিথ্যা মামলা দিয়ে গুলি চালিয়ে বা প্রয়োজনে হত্যা করে তাদের অবৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। অন্যদিকে মুসলমানরা দাড়ি রাখলে তাদের প্রত্যেককে আড়াই টাকা করে কর দিতে হবে। সে সময় হিন্দু জমিদাররা মসজিদ পুড়ে দিয়ে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ওয়াহাবি ও ফরায়েজী আন্দোলনের সাথে একাত্বতা প্রকাশ করে হিন্দু মুসলমান কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে জমিদার, নীলকর অবশেষে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের জন্য ৮৬ হাজার কৃষক সেনা তিতুমীর তৈরি করেন। ছোট খাটো সংঘর্ষে তিতুমীরের সঙ্গে না পেরে তারা সকলে ঐক্যবদ্ধ হন। আর এ দিকে তিতুমীর নারিকেল বাড়িয়ায় বাঁশ ও মাটি দিয়ে অনেক গুলো আলাদা আলাদা ঘর তৈরি করে স্বাধীনতার চেতনা ও বিপ্লবের প্রতীক একটি বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন। যার প্রধান সেনাপতি ছিলেন ভাগ্নে গোলাম মাসুম এবং অস্ত্র ছিল তলোয়ার, লাঠি, সড়কি, ইটের টুকরো ও বেল। ১৮৩১ সালের ১৯শে নভেম্বর কর্ণেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী ও বন্দুক ধারী সৈন্যদের সাথে তিতুমীরের বাহিনীর এক ভীষন যুদ্ধ হয়। তিতুমীর ও তাঁর চল্লিশ জন সহচর শহীদ হন। অনেকেই বন্দী এবং প্রহসনের বিচারে সাজাপ্রাপ্ত হন। প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুমকে কামানের গোলায় সেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাঁশের কেল্লার সামনে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং শহীদ তিতুমীর ও তাঁর সঙ্গীদের মৃতদেহগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়। কারণ মৃতদেহ দেখে যদি কেউ আবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। দেশপ্রেমিক তিতুমীর নির্ভীক বীরের মত যুদ্ধ করে সঙ্গীসহ শহীদ হন। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট আর তখনকার সময়ের প্রেক্ষাপট এক নয়। সময়ের বিচারে তার বাঁশের কেল্লা ছিল শোষিতের পক্ষে একটা মাইলফলক তা অস্বীকার করার উপায় নেই। যুদ্ধের কৌশলের দিক থেকে বিচার করলে দেখাযায়, বাঁশের কেল্লার আশেপাশে একশ বর্গমাইলের মধ্যে লুকোবার কোন জায়গা ছিল না। প্রকৃত বীরেরা পরাজয় বা মৃত্যুকে কখনো পরোয়া করে না। অত্যাচারী জমিদার, নীলকর এবং ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম করে শহীদেরা পরবর্তী কালে তথা স্বাধীনতাকামী বা মুক্তিযোদ্ধাদের পথপ্রদর্শক হয়ে চিরস্মরনীয় হয়ে আছেন। শহীদেরা অনেক দূরে চলে গেলেও যুগে যুগে সত্য ও ন্যায়ের তথা মানবতার পথে সংগ্রামীদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন।

লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
০১৭১৭-৯৭৭৬৩৪, শধরংধৎফরহধলঢ়ঁৎ@ুধযড়ড়.পড়স

ভূমিকা
মোঃ কায়ছার আলী
ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মিয়ানমার সফরে গিয়ে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধি সৌধ পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি পরিদর্শক বইতে লিখেছিলেন, হিন্দুস্থানে তুমি দু’গজ মাটি পাওনি সত্য, তবে তোমার আত্মত্যাগ থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আওয়াজ উঠেছিল। দুর্ভাগ্য তোমার নয় জাফর, স্বাধীনতার বার্তার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষের সুনাম ও গৌরবের সঙ্গে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর বা দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ (২৪ অক্টোবর ১৭৭৫-৭ নভেম্বর ১৮৬২) মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বশেষ প্রতিনিধি, মরমী কবি ও সুফি সাধক সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের জীবন ইতিহাসের বড় ট্রাজেডি হয়ে আছে। তাঁর রচিত কবিতা ও গজল এই ভাগ্য বিড়ম্বিত সম্রাটের নির্বাসিত জীবনের একাকিত্ব, বিষাদ আর অসহায়ত্বের অনবদ্য সাক্ষ্য বহন করছে। যে কয়েকজন প্রবাদপুরুষ অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেম ও চরম আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছিলেন, এই বাংলার মাটিতে স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ বপন করেছিলেন তন্মধ্যে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন সম্রাট বাবর, হুমায়ন, আকবর, জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের উত্তরসূরি শেষ মুঘল সম্রাট। মুঘল সাম্রাজ্যের মহাদুর্দিনে তিনি ভারতবর্ষের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বাহাদুর শাহ জাফর সিপাহিদের বিপ্লব তথা ভারতবর্ষের প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন – এই সংবাদে কানপুর, লক্ষ্মৌ, বিহার, ঝাঁসি, বেরিলি থেকে শুরু করে পশ্চিম ও পূর্ববাংলার সর্বত্র সিপাহিরা গর্জে ওঠে খালক-ই-খুদা, মুলক-ই-বাদশাহ, হুকুম-ই সিপাহি, অথাৎ আল্লাহর দুনিয়া, বাদশাহ রাজ্য, সিপাহির হুকুম। একের পর এক সেনা ছাউনিতে বিদ্রোহ হতে থাকে। ইংরেজরা অতি নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমন করে। হাজার হাজার স্বাধীনতাকামীর রক্তে রঞ্জিত হয় ভারত বর্ষের মাটি। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষও বিক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু ভারতীয়দের এই সংগ্রাম সফল হতে পারেনি। ইংরেজরা দিল্লি দখল করে নেয় এবং সম্রাট ২১ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পন করেন। ইংরেজ সৈন্যরা মির্জা মুঘল, মির্জা খিজির সুলতান, মির্জা আবু বকরসহ ২৯ জন মুঘল শাহজাদা ও বহু আমির ওমরাহ, সেনাপতি এবং সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সম্রাটকে বিচারের নামে প্রহসনের আদালতে দাঁড় করানো হয়। ইংরেজ সরকার তাঁর শাস্তি চরম অর্থাৎ মৃত্যুদন্ড হওয়া উচিত। কিন্তু তাঁর বার্ধক্যের কথা বিবেচনা করে প্রান দন্ডদেশ না দিয়ে বেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ১৭৫৭ সালে ২৩শে জুন ভাগীরথীর তীরে পলাশির প্রান্তরে সেই যুদ্ধে প্রবীন সেনাপতি মির্জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা তথা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে এবং তিনি নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন। তখন বাংলার কর্ণধার হয়ে ক্ষমতার বসলেন কোম্পানীর এক সামান্য চাকুরে, ধূর্ত ও দুধর্ষ ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ। সেই থেকে শুরু এবং পরবর্তী একশ বছরের মধ্যে দেখা গেল তাদের অধিকাংশ তাদের পদানত। ছোট একটি কোম্পানী হয়ে হয়ে গেল ভারতবর্ষের মত এত বড় একটা দেশের মালিক। ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথ ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের “দি গর্ভনর এন্ড কোম্পানী অফ মার্চেন্টস অফ লন্ডন ট্রেডিং ইনটু দি ইন্ডিজ” কে অনুমতি দেন প্রাচ্যে বানিজ্য করার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রথমে বাণিজ্যের অনুমতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য মোঘল সম্রাট, সুবাদার থেকে শুরু করে যখন যার দরকার তখন তার কাছে দরবার করেছে, অপমানিত হয়েছে কিন্তু হাল ছাড়েনি বা ধৈর্য হারায়নি। ১৬১৩ সালে মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এই কোম্পানীকে বানিজ্য কুঠি স্থাপনে অনুমতি দেন। আর এদিকে দিল্লীর মসনদের সম্রাট শাহজাহানের চার পুত্র ও দুই কন্যার মধ্যে অশান্তির দাবানল জ্বলছিল। দারাশিকো সর্বাপেক্ষা প্রীতিভাজন, সুজা অসুস্থ পিতার সংবাদে দিল্লী অভিমুখে গিয়ে বারানসির যুদ্ধে দারার কাছে পরাজিত হন। আওরঙ্গজেব ও মুরাদ দুজনে মিলে দারাকে পরাজিত করেন, কথা ছিল সিংহাসনে বসবেন মুরাদ। দারা পরাজিত হলেন এবং পাঞ্জাবে পালিয়ে গেলেন। এক উৎসব রজনীর অবসানে সুজাসহ বন্দী হল মুরাদ। আওরঙ্গজেব নিজেকে সম্রাট ঘোষনা করলেন এবং আগ্রা দুর্গে পিতা শাহ্জাহান বন্দী হলেন। এক নিশীথকালে আওরঙ্গজেব পিতার কাছে পাঠালেন এক সুদৃশ্য মোড়ক। পরতের পর পরত খুলে দেখে পুত্র দারাশিকোর খন্ডিত মুন্ড। রোশনারা ভাই শাহজাহানের পক্ষ নিলেন। বোন জাহানারার øেহভাজন এক বাদীর হঠাৎ বসনে আগুন লেগে যায়। আগুন নিভাতে গিয়ে দগ্ধ হন জাহানারা। ফলে তাঁর জীবন সংশয় দেখা দেয়। খবর পেয়ে চিকিৎসা করতে আসেন ইংরেজ চিকিৎসক গ্যাব্রিয়েল বাউটন। সামাজিক প্রথার বাইরে হলেও জাহানারার সম্মাতিতে বা জীবন বাঁচানোর স্বার্থে চিকিৎসক রোগীকে নিজ চোখে দেখেন এবং চিকিৎসা করেন। জাহানারা সুস্থ হয়ে উঠলেন। পুরস্কার হিসেবে বাউটন ব্যক্তিগতভাবে কিছু না চেয়ে কলকাতা থেকে ১৪০ মাইল দক্ষিনে বালাশোররে কুঠি নির্মানের এবং বিনা শুল্কে বানিজ্য লাভের অধিকার চাইলেন। ইংরেজরা তৎকালীন মোঘল সম্রাট আজম-উশ-শানের কাছে ১৬১০ সালে হুগলী নদীর তীরবর্তী সুতানটি গ্রামটি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে এর সাথে যোগ হয় কলকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রাম। তারা ১৬৫১ সালে হুগলীতে ও ১৬৫৮ সালে কাশিমবাজারে বানিজ্যকুঠি স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে তাদের সাম্রাজ্যবাদ বি¯তৃত হতে লাগল। ১৮৫৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা সিপাহী বিপ্লবের পর কোম্পানীর কাছ থেকে গ্রেট ব্রিটেনের রাণী ভিক্টোরিয়া এদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। ভারতবর্ষের কাপড় এবং ঢাকার মসলিন পৃথিবীর বিখ্যাত ছিল। ১৭৬৮ সালে জেমস্ ওয়াট বাষ্প চালিত ইঞ্জিন আবিস্কার করলে ইংল্যান্ড কৃষি থেকে শিল্প বিপ্লবের দিকে যাত্রা শুরু করে। লর্ড কর্ণওয়ালিস ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন জারি করলে শাসক ও শোষিত দুইটি শ্রেণি তৈরি হয়। জমিদারের নাতির জন্মদিন, জামাই আসবে ইত্যাদি বলে তাদের পোষা পাইক, পেয়াদা, লাঠিয়াল বাহিনী কৃষকদের কাছ থেকে জুলুম করে খাজনা নিত। জমিদার আর কৃষকের মাঝামাঝি মধ্যস্বত্বভোগী মহাজন কাজকর্ম ছাড়াই খাজনা নিয়ে তৈরি হল। মুসলমানেরা ইংরেজি না জানার জন্য চাকরি বাকরি সহ সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হল। অত্যাচারিত হতে হতে তাদের মধ্যে একটা বিদ্রোহ ভাব দেখা দিল। ঊনিশ শতকে ভারত জুড়ে ওয়াহাবি বিদ্রোহ হয়েছিল এবং এর নেতৃত্বে ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান বায়বেরিলির সৈয়দ আহমদ। তাঁর আদর্শে ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন তিতুমীর এবং হাজী শরীয়তউল্লাহ। এ আন্দোলন শুধু ধর্মীয় আন্দোলনই ছিল না এর সঙ্গে অর্থনীতি ও রাজনীতি জড়িত ছিল। ওয়াহাবিরা চেয়েছিলেন ইংরেজ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে। তারা বলতেন, দারুল-হরব বা শত্র“র দেশ। ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবর্তক ও নেতা হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার ছোট্ট গ্রাম শ্যামাইলে ১৭৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকালে তাঁর মা এবং আট বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। গ্রামের মক্তবে পড়াশুনা শেষ করে হুগলীর ফুরফুরা গিয়ে আরবী ও ফার্সি ভাষা শিখে বিভিন্ন ইসলামী ব্যক্তিবর্গের সাহচর্যে থাকার পর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় কিছু দিন থেকে নিজ দেশে ফিরে আসেন। সে সময় বাংলার মুসলমানের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর করে এবং বেদআত ও র্শেক মুক্ত ইসলাম পালনের জন্য তাঁর অনুসারীদের নিদের্শ দেন। কবর পূজা, পীর পূজা, সেজদা দেওয়া হল র্শেক এবং মহরমের মাতম করা, গাজী কালু, খাজা খিজিরের আরাধনা বা পঞ্চপীরের গুন গাওয়া বেদআত। সে সময় হিন্দু জমিদাররা মুসলমান কৃষকদের কাছে জোর জবরদস্তি করে নানা রকম পূজার খাজনা আদায় করতেন। আবার কুরবানির সময় মুসলমান প্রজাদের কুরবানি দেওয়া শুরু করলে জমিদারদের সাথে বিরোধ দেখা দেয়। বিরোধিতা এবং তাঁর অনুসারীর সংখ্যা একই সাথে বাড়তে থাকে। তিনি চেয়েছিলেন সামাজিক এবং ধর্মীয় জীবনে পরিশুদ্ধির মাধ্যমে মুসলমানেরা যেন নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখে। ১৮৪০ সালে তাঁর মৃত্যু হলে ছেলে দুদু মিয়া (জন্ম ১৮১৯) ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহন করেন। মক্কা শরীফ থেকে শিক্ষা লাভের পর অসাধারণ সাংগঠনিক গুনের অধিকারী দুুদু মিয়া ফরায়েজীদেরকে সংঘবদ্ধ ও সুসংহত করে তাদের মধ্যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জাগরিত করেন। জামিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য তিনি এক শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন। সংগঠনের সুবিধার্থে তিনি বাংলাদেশকে কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করেন। প্রত্যেক অঞ্চলের জন্য এক একজন করে খলিফা নিযুক্ত করেন এবং ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি, বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ কূটনৈতিক কলাকৌশল প্রয়োগ ইত্যাদি খলিফাদের কাজ ছিল। নিজ নিজ অঞ্চলের সমস্ত খবরাখবর দুদু মিয়াকে নিয়মিতভাবে জানানো ছিল খলিফাদের অপর একটি কাজ। দুদু মিয়া জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারে জর্জরিত কৃষক, শ্রমিক, কারিগর প্রভৃতি দরিদ্র ও নির্যাতিত মানুষকে সংঘবন্ধ করেন। তাঁর পিতার সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারকে বৈপ্লবিক স্তরে উন্নীত করেন। তাঁর কর্মসূচি ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। ফলে এ আন্দোলনের গুনগত পরিবর্তন ঘটে। তিনি ঢাকা, পাবনা, যশোর, মালদহ, বারাসত প্রভৃতি অঞ্চলে অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবর্তীণ হন। এর ফলে জমিদার, নীলকর ও ব্রিটিশ সরকার সম্মিলিতভাবে দুদু মিয়ার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জোট গঠন করে। ১৮৪৭ সালে তিনি এ সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এ সংগ্রাম দমনে ব্যর্থ হয়ে সরকার দুদু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। ১৮৬০ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের আতঙ্ক দুদু মিয়া ১৮৬২ সালে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। যোগ্য উত্তরসুরি না থাকায় তাঁর নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ হয়নি। ফলে ফরায়েজী আন্দোলন দূর্বল হয়ে পড়ে। আন্দোলন কখনো কখনো থার্মোমিটারের পারদের মতো উঠানামা করে। ১৭৮২ সালে চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার বসিরহাট থানার অন্তর্গত চাঁদপুর গ্রামে এক আলোকবর্তিকা বা ধূমকেতুর জন্ম হয়। যাঁর নাম মীর নিসার আলী তিতুমীর। ফার্সি, আরবী, উর্দু, বাংলা এবং অংক বিষয়সহ স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি খেলাধুলায়ও পারদর্শিতা অর্জন করেন। তাঁর জন্মভূমি চব্বিশ পরগনা থেকে নদীয়া পর্যন্ত ছিল নীল চাষের কেন্দ্রবিন্দু। নীল নামক এক প্রকার গাছ থেকে রং সংগ্রহ করা হত। এ রং সুতি বস্ত্রে ব্যবহার করলে ঐ কাপড়ের চাহিদা ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। এ জন্য ইংরেজ নীলকররা বাংলায় আগমন করে নীল উৎপাদিত অঞ্চলসমূহে কুঠি স্থাপন করে কৃষকের উৎকৃষ্ট জমিতে দাগ দিয়ে বিনামূল্যে বীজ যোগান দিয়ে দাদন প্রথার প্রচলন করে, দেড়বিঘাকে এক বিঘা জমি হিসাব করে, জাল চুক্তিপত্র তৈরি করে, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে অমানসিক নির্যাতন চালিয়ে, বাড়িঘর পুড়ে ফেলে, স্ত্রী কন্যাকে অপহরণ করে, কৃষকের গরু বাছুর ধরে নিয়ে আটকে রেখে, মিথ্যা মামলা দিয়ে গুলি চালিয়ে বা প্রয়োজনে হত্যা করে তাদের অবৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। অন্যদিকে মুসলমানরা দাড়ি রাখলে তাদের প্রত্যেককে আড়াই টাকা করে কর দিতে হবে। সে সময় হিন্দু জমিদাররা মসজিদ পুড়ে দিয়ে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ওয়াহাবি ও ফরায়েজী আন্দোলনের সাথে একাত্বতা প্রকাশ করে হিন্দু মুসলমান কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে জমিদার, নীলকর অবশেষে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের জন্য ৮৬ হাজার কৃষক সেনা তিতুমীর তৈরি করেন। ছোট খাটো সংঘর্ষে তিতুমীরের সঙ্গে না পেরে তারা সকলে ঐক্যবদ্ধ হন। আর এ দিকে তিতুমীর নারিকেল বাড়িয়ায় বাঁশ ও মাটি দিয়ে অনেক গুলো আলাদা আলাদা ঘর তৈরি করে স্বাধীনতার চেতনা ও বিপ্লবের প্রতীক একটি বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন। যার প্রধান সেনাপতি ছিলেন ভাগ্নে গোলাম মাসুম এবং অস্ত্র ছিল তলোয়ার, লাঠি, সড়কি, ইটের টুকরো ও বেল। ১৮৩১ সালের ১৯শে নভেম্বর কর্ণেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী ও বন্দুক ধারী সৈন্যদের সাথে তিতুমীরের বাহিনীর এক ভীষন যুদ্ধ হয়। তিতুমীর ও তাঁর চল্লিশ জন সহচর শহীদ হন। অনেকেই বন্দী এবং প্রহসনের বিচারে সাজাপ্রাপ্ত হন। প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুমকে কামানের গোলায় সেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাঁশের কেল্লার সামনে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং শহীদ তিতুমীর ও তাঁর সঙ্গীদের মৃতদেহগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়। কারণ মৃতদেহ দেখে যদি কেউ আবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। দেশপ্রেমিক তিতুমীর নির্ভীক বীরের মত যুদ্ধ করে সঙ্গীসহ শহীদ হন। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট আর তখনকার সময়ের প্রেক্ষাপট এক নয়। সময়ের বিচারে তার বাঁশের কেল্লা ছিল শোষিতের পক্ষে একটা মাইলফলক তা অস্বীকার করার উপায় নেই। যুদ্ধের কৌশলের দিক থেকে বিচার করলে দেখাযায়, বাঁশের কেল্লার আশেপাশে একশ বর্গমাইলের মধ্যে লুকোবার কোন জায়গা ছিল না। প্রকৃত বীরেরা পরাজয় বা মৃত্যুকে কখনো পরোয়া করে না। অত্যাচারী জমিদার, নীলকর এবং ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম করে শহীদেরা পরবর্তী কালে তথা স্বাধীনতাকামী বা মুক্তিযোদ্ধাদের পথপ্রদর্শক হয়ে চিরস্মরনীয় হয়ে আছেন। শহীদেরা অনেক দূরে চলে গেলেও যুগে যুগে সত্য ও ন্যায়ের তথা মানবতার পথে সংগ্রামীদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন।